নিজস্ব প্রতিবেদক, RailXBD (সৌজন্যে: এখন টিভি) | ৫ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লার বিভিন্ন স্টেশনে রেলওয়ের মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরির মহোৎসব চলছে। বিশেষ করে ময়নামতি রেল স্টেশন এলাকায় সিগন্যাল পয়েন্ট মেশিন, মোটর এবং ক্যাবলসহ অন্তত ৫ কোটি টাকারও বেশি যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। এতে করে দেশের ব্যস্ততম এই রেলপথে ট্রেন চলাচল চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ময়নামতি স্টেশনে চুরির ভয়াবহ চিত্র
সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়নামতি স্টেশনের সিগন্যাল ব্যবস্থার হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এক এক করে খুলে নেওয়া হয়েছে ১৪টি সিগন্যাল পয়েন্ট মেশিন, মোটর এবং ভূগর্ভস্থ ক্যাবল। স্টেশনে ১০টি সিগন্যাল খুঁটি দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলোতে নেই কোনো ল্যাম্প। শুধু তাই নয়, রেললাইনের সংযোগস্থল থেকে নাট-বল্টু, স্লাইড চেয়ার প্লেট, লক প্লেট এবং স্ক্রু-স্পাইকও খুলে নিয়েছে চোরচক্র। এমনকি স্টেশন ভবনের ভেতর থেকে ফ্যান, বাল্ব এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও উধাও হয়ে গেছে, যার ফলে স্টেশনটি এখন একটি পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।
কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি ও অপারেশনাল সংকট
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে:
- প্রতিটি সিগন্যাল পয়েন্ট মেশিনের দাম প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
- প্রতিটি সিগন্যাল ল্যাম্পের দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
- গত কয়েক মাসে শুধু ময়নামতিতেই ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি টাকার বেশি।
- কুমিল্লার ৫টি স্টেশনের ৬৭টি স্বয়ংক্রিয় পয়েন্ট মেশিনের মধ্যে ৩৯টি মোটরই চুরি হয়ে গেছে।
এই চুরির ফলে বর্তমানে লুপ লাইনে ট্রেন চলাচল, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন পাসিং সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টেশনটি তার কার্যক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়েছে, যা ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে নিরাপদ ট্রেন চলাচলের জন্য বড় হুমকি।
যোগসাজশের অভিযোগ ও আইনি সীমাবদ্ধতা
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ের ভেতরের অসাধু মহলের যোগসাজশ ছাড়া এই ধরনের ভারী ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশ চুরি করা সম্ভব নয়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে মামলা ও গ্রেপ্তার হয়েছে, কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে আসামিরা দ্রুত বেরিয়ে আসছে।
কুমিল্লা রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান জানান, “আমরা নিয়মিত লিখিত অভিযোগ দিচ্ছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাচ্ছি। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও কঠোর হলে এই চুরি ঠেকানো সম্ভব।” আরেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী আহমদ আলী জানান, তারা টহল ও নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, “রেল যে সেবা দিতে প্রস্তুত, জনগণ যেন তা পায় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।” স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, সিগন্যাল ও লাইনের যন্ত্রাংশ না থাকায় যে কোনো সময় বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একটি বড় প্রাণহানির পর টনক না নড়ে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তাদের।
রেলওয়ের সম্পদ মানে জাতীয় সম্পদ। কুমিল্লার এই ঘটনাটি পুরো রেলওয়ের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। অবিলম্বে পাহারা বাড়ানো এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।



